Close

    ত্রিপুরা হাইকোর্ট

    TRIPURAHC.JPG

    সংক্ষিপ্ত পরিচয়:

    মহাভারতের সময় থেকে ত্রিপুরার রাজত্বের আধিপত্য দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর থেকে উত্তর ও পশ্চিমে ব্রহ্মপুত্র এবং পূর্বে বার্মা, বর্তমানে মায়ানমার পর্যন্ত বিস্তৃত পূর্ববঙ্গের বৃহত্তর অংশকে ঘিরে ছিল। ত্রিপুরার ইতিহাসের আদি নিদর্শন অশোক স্তম্ভের শিলালিপিতে পাওয়া যায়। ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, ৭ম শতাব্দীর দিকে, ত্রিপুরার রাজারা যাদের ‘ফা’ উপাধি ছিল যার অর্থ পিতা, তারা উত্তর ত্রিপুরার কৈলাসহর অঞ্চল থেকে শাসন করে গেছেন।
    চতুর্দশ শতাব্দীতে কৈলাশহর থেকে উদয়পুরে রাজধানী স্থানান্তরের সঙ্গে সঙ্গে ত্রিপুরার ইতিহাসে পরিবর্তন আসে। সেই সময়ই ত্রিপুরী রাজারা মাণিক্য উপাধি গ্রহণ করেন এবং মাণিক্য রাজবংশ, যা ইন্দো-মঙ্গোলীয় বংশোদ্ভূত ছিল, ইতিহাসবিদদের মতবাদ অনুযায়ী তারা প্রায় ৩০০০ বছর ত্রিপুরা শাসন করেন। মুঘলরা যখন কেন্দ্রীয় শাসক ছিলেন তখনও মাণিক্যদের আধিপত্য স্বীকার করেন। ত্রিপুরার ইতিহাসে ১৭শ শতাব্দী একটি প্রধান সন্ধিক্ষণ, যখন এই অঞ্চলের প্রশাসন মুঘলদের হাতে চলে যায় এবং কিছু ক্ষমতা মাণিক্যদের হাতে রয়ে যায়। ঔপনিবেশিক যুগে, ব্রিটিশরা মাণিক্য রাজাদের কিছু সীমিত স্বাধীনতা প্রদান করে ত্রিপুরার উপর তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রসারিত করে। ত্রিপুরার রাজবংশীয় ইতিহাসের অবসান ঘটে যখন রাজশাসিত রাজ্যটি ১৯৪৯ সালের ১৫ই অক্টোবর ভারতীয় ইউনিয়নে অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯৪৭ সালের ১৭ই মে শেষ রাজা, মহারাজা বীর বিক্রম কিশোর মাণিক্যের মৃত্যুর পর, নাবালক যুবরাজ কিরীট বিক্রম কিশোর মাণিক্য বাহাদুরের সহযোগিতার জন্য মহারাণী কাঞ্চন প্রভা দেবীর নেতৃত্বে একটি রাজপ্রতিনিধিত্ব পরিষদ গঠন করা হয়। সেই রাজপ্রতিনিধি ভারত সরকারের সঙ্গে একত্রীকরণ চুক্তি স্বাক্ষর করেন। একত্রীকরণের পর ত্রিপুরা পার্ট ‘সি’ রাজ্যে পরিণত হয়। ১৯৫৬ সালের নভেম্বর মাসে রাজ্যগুলির পুনর্গঠনের পর ত্রিপুরা একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত হয় একটি উপদেষ্টা কমিটি সহ প্রধান কমিশনারকে সহযোগিতা করার জন্য ও পরামর্শ দেওয়ার জন্য। তারপর ১৯৫৭ সালের ১৫ই আগস্ট উপদেষ্টা কমিটির পরিবর্তে প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে একটি আঞ্চলিক পরিষদ গঠন করা হয়। ১৯৬৩ সালের ১লা জুলাই ত্রিপুরা আঞ্চলিক পরিষদ ভেঙে দেওয়া হয় এবং আঞ্চলিক পরিষদের বর্তমান সদস্যদের নিয়ে বিধানসভা গঠিত হয়। ১৯৭২ সালের ২১শে জানুয়ারি উত্তর-পূর্বাঞ্চল (পুনর্গঠন) আইন, ১৯৭১ নামে সংসদ আইনের মাধ্যমে ত্রিপুরা পূর্ণাঙ্গ রাজ্যে পরিণত হয়।

    বর্তমান ত্রিপুরা অঞ্চলটি প্রধানত পাহাড়ী এলাকা যার ভৌগোলিক আয়তন ১০৪৯১ বর্গ কিলোমিটার এবং বাংলাদেশের ব-দ্বীপ অববাহিকা দ্বারা তিন দিকে বেষ্টিত এবং এর মধ্য দিয়ে কর্কটক্রান্তি রেখা অতিক্রম করে

    1

    স্টেট অফ হিল তিপেরা (1876) এর পরিসংখ্যানগত বিবরণে ডাব্লু.ডাব্লু. হান্টার পর্যবেক্ষণ করেছেন যে:

    ১৮৭৩-৭৪ সাল অবধি পার্বত্য তিপেরার আদালত ন্যায়বিচার এবং সৎ বিবেকের একটি আদিম ব্যবস্থা অনুসারে ন্যায়বিচার প্রদান করত এবং কোন নিয়মিত বিচারিক পদ্ধতি ছিল না (পৃষ্ঠা – ৪৬২)।

    কোনও ঐতিহাসিক নথি কিংবা ইতিহাসবিদের এখনও পর্যন্ত ঔপনিবেশিক প্রশাসকদের গতানুগতিক ধারায় এই দাবীর বিরোধিতা করার কোন নজির নেই। ১৮৭৩-৭৪ সালের আগে ফৌজদারি মামলায় শাস্তি নিয়ন্ত্রণের জন্য কিছু প্রাথমিক ঘোষণা প্রদান করা হয়েছিল কিন্তু কোন তত্ত্বাবধায়ক আদালত ছিল না। রাজা ছিলেন ন্যায়বিচারের প্রধান উৎস। বিচার প্রশাসন ১৮৭৩-৭৪ সালে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের সাক্ষী হয় যখন রাজা কর্তৃক একটি ফৌজদারি কার্যবিধি, একটি দেওয়ানী কার্যবিধি, একটি পুলিশ নির্দেশিকা, সীমাবদ্ধতা আইন এবং প্রমাণ আইন ইত্যাদি সম্বলিত নয়টি আইন জারি করা হয়। ১৮৭৪ সালে, আগরতলায় দুটি ম্যাজিস্ট্রেট আদালত এবং মূল এখতিয়ারের একটি দেওয়ানি আদালত প্রতিষ্ঠিত হয়। একটি আপিল আদালত এবং বিশেষ আপিলের জন্য একটি আদালত ছিল। মূল এখতিয়ারের দুটি ফৌজদারি আদালত ছিল, একটির এখতিয়ার ছিল পার্বত্য উপজাতিদের ওপর এবং অন্যটির ছিল বাঙালী ও মণিপুরীদের ওপর। এই আদালতগুলির কার্যাবলী ছিল আংশিকভাবে আইন প্রণয়নমূলক এবং আংশিকভাবে বিচারিক। আইন প্রণয়নের উদ্দেশ্যে মহারাজাগণ একটি রাজ্য পরিষদ গঠন করেছিলেন, যার ক্ষমতা অবশ্য মহারাজার সম্মতি সাপেক্ষে ছিল। মহারাজার কাছে আবেদনের শুনানির জন্য তিনজন সদস্য নিয়ে প্রিভি কাউন্সিল গঠিত হয়। ত্রিপুরা জেলা গেজেটে নথিভুক্ত করা হয়েছে যে, মহারাজা কর্তৃক অনুমোদিত আদালতের রায়গুলি ব্রিটিশ সরকারের কোনও আধিকারিকের দ্বারা সংশোধনের অধীন ছিল না। আদালত গঠন আইন, ১৩১৮ টি.ই (১৯০৮ খ্রিষ্টাব্দের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ) অনুসারে, মহকুমা স্তরে বেশ কয়েকটি আদালত প্রতিষ্ঠিত হয়। মূল এবং আপিল পক্ষ সহ একটি খাস আদালত বা প্রধান আদালতও প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সমস্ত আদালতের ভাষা ছিল বাংলা। এটি নথিভুক্ত করা হয়েছে যে ১৯০৫-০৬ সালে বিভিন্ন মহকুমা জুড়ে বিস্তৃত দেওয়ানী এবং ফৌজদারি উভয় মামলার জন্য মূল এখতিয়ারের দশটি আদালত ছিল। ১৯৪৯ সালের ১৫ই অক্টোবর ভারতের সঙ্গে ত্রিপুরার সংযুক্তির পর, ২৬ জানুয়ারী, ১৯৫০ থেকে ত্রিপুরা (আদালত) আদেশ ১৯৫০ কার্যকর হয়। ১৯৫০ সালের ত্রিপুরা (আদালত) আদেশের ৩ ও ১৫ নং ধারার অধীনে বিচার বিভাগীয় কমিশনার আদালত, জেলা জজ আদালত, অধস্তন জজ আদালত, মুন্সিফ আদালত প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এইভাবে, সংযুক্তির পরে, ত্রিপুরার বিচার ব্যবস্থা ভারতের অন্যান্য রাজ্যের মতোই হয়ে ওঠে এবং ধীরে ধীরে ত্রিপুরা সরকার ত্রিপুরার আঞ্চলিক এখতিয়ারের মধ্যে কার্যকরী বিভিন্ন রাজ্য আইন গ্রহণ করেছে অথবা তারা কেন্দ্রীয় আইনগুলিকে প্রসারিত করেছে। বিচার বিভাগীয় কমিশনার আদালত ছিল ত্রিপুরার সর্বোচ্চ আদালত এবং এটি ২০শে জানুয়ারী, ১৯৭২ অব্দি একটি উচ্চ আদালতের প্রায় সমস্ত কার্য সম্পাদন করত।

    2

    পুনর্গঠনের পর, উত্তর-পূর্বাঞ্চল (পুনর্গঠন) আইন, ১৯৭১ (১৯৭১ সালের ৮১ নং ধারা) কার্যকর করার মাধ্যমে যখন ত্রিপুরা একটি পূর্ণাঙ্গ রাজ্যে পরিণত হয়, তখন আসাম ও নাগাল্যান্ড উচ্চ আদালতকে উক্ত পুনর্গঠন আইন, ১৯৭১-এর ২৮ নং ধারার পরিপ্রেক্ষিতে বিলুপ্ত করা হয় এবং এবং আসাম, নাগাল্যান্ড, মেঘালয়, মণিপুর ও ত্রিপুরা এই পাঁচটি রাজ্য এবং দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল (কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল মিজোরাম ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল অরুণাচল প্রদেশ)-এর জন্য একটি অভিন্ন উচ্চ আদালত প্রতিষ্ঠিত হয়। আসাম ও নাগাল্যান্ড হাইকোর্টের নাম পরিবর্তন করে গৌহাটি হাইকোর্ট (আসাম, নাগাল্যান্ড, মেঘালয়, মণিপুর এবং ত্রিপুরা হাইকোর্ট) রাখা হয়। আবার, মিজোরাম রাজ্য আইন, ১৯৮৬ (১৯৮৬ সালের ৩৪ নং আইন) এবং অরুণাচল প্রদেশ রাজ্য আইন, ১৯৮৬ (১৯৮৬ সালের ৬৯ নং আইন) -এর প্রণয়নের মাধ্যমে মিজোরাম এবং অরুণাচল প্রদেশ ২০.০২.১৯৮৭ তারিখে পূর্ণাঙ্গ রাজ্যের মর্যাদা লাভ করে। নির্ধারিত দিন অর্থাৎ ২০.০২.১৯৮৭ তারিখে কার্যকরী হওয়া মিজোরাম রাজ্য আইন, ১৯৮৬ এর পরিপ্রেক্ষিতে আসাম, নাগাল্যান্ড, মেঘালয়, মণিপুর, ত্রিপুরা এবং মিজোরাম রাজ্যের অভিন্ন হাইকোর্ট আসাম, নাগাল্যান্ড, মেঘালয়, মণিপুর, ত্রিপুরা এবং মিজোরামের হাইকোর্টে পরিণত হয়।

    একইভাবে অরুণাচল প্রদেশ আইন, ১৯৮৬-এর পরিপ্রেক্ষিতে নির্ধারিত দিন অর্থাৎ ২০.০২.১৯৮৭ তারিখ থেকে আসাম, নাগাল্যান্ড, মেঘালয়, মণিপুর, ত্রিপুরা, মিজোরাম এবং অরুণাচল প্রদেশ রাজ্যের জন্য অভিন্ন হাইকোর্ট গুয়াহাটিতে প্রধান আসন নিয়ে গঠিত হয়েছিল। প্রতিটি রাজ্যে উল্লিখিত হাইকোর্টের বেঞ্চগুলি বিভিন্ন তারিখে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ২৪.০১.১৯৭২ তারিখে ত্রিপুরা অভিন্ন হাইকোর্টের বেঞ্চ পায়। সেই বেঞ্চগুলি অবশেষে স্থায়ী বেঞ্চে রূপান্তরিত হয় এবং একই দিনে তথা ১৪ই মে, ১৯৯২ তারিখে রাষ্ট্রপতির ঘোষণার মধ্য দিয়ে অনুমোদিত তিনজন স্থায়ী বিচারক সহ ত্রিপুরা স্থায়ী বেঞ্চ লাভ করে।

    ত্রিপুরার জনগণ তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধি এবং আইনি পরিমণ্ডল দ্বারা একটি পৃথক হাইকোর্টের জন্য বাসনা অব্যাহত রাখে এবং অবশেষে উত্তর-পূর্বাঞ্চল(পুনর্গঠন) এবং অন্যান্য সম্পর্কিত বিধি (সংশোধনী) আইন, ২০১২ নামক আইনের মাধ্যমে ঘোষণা করা হয় যে মেঘালয় ও মণিপুরের মতো দুটি রাজ্যের সাথে ত্রিপুরা রাজ্যও তাদের পৃথক হাইকোর্ট পাবে। এই উদ্দেশ্যে মূল আইনে কিছু উল্লেখযোগ্য সংশোধনী আনা হয়েছে।

    ২৮ক.(১) উত্তর- পূর্বাঞ্চল (পুনর্গঠন) এবং অন্যান্য সম্পর্কিত বিধি (সংশোধনী) আইন, ২০১২-এর সূচনার সঙ্গে একটি করে হাইকোর্ট থাকবে:

    (ক) মেঘালয় রাজ্যের জন্য থাকবে মেঘালয় হাইকোর্ট নামে;
    (খ) মণিপুর রাজ্যের জন্য থাকবে মণিপুর হাইকোর্ট নামে;
    (গ) ত্রিপুরা রাজ্যের জন্য থাকবে ত্রিপুরা হাইকোর্ট নামে;

    ভারত সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় উত্তর-পূর্বাঞ্চল (পুনর্গঠন) এবং অন্যান্য সম্পর্কিত বিধি (সংশোধনী) আইন, ২০১২ এর ১নং ধারার উপ-ধারা (২) এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৩ সালের ২৩শে মার্চ এই আইন কার্যকর হওয়ার তারিখ নির্ধারণ করেছে। তার আগে ভারতের সংবিধানের ২১৭(১) অনুচ্ছেদ দ্বারা প্রদত্ত ক্ষমতাবলে রাষ্ট্রপতির ঘোষণার ভিত্তিতে হিমাচল প্রদেশ হাইকোর্টের বিচারপতি শ্রী দীপক গুপ্তা ২৩শে মার্চ, ২০১৩ থেকে ত্রিপুরা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি হিসাবে নিযুক্ত হন এবং অন্যান্য প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে অন্যান্য বিচারপতিগণ, যাঁরা আনুষ্ঠানিকভাবে গৌহাটি হাইকোর্টের বিচারপতি ছিলেন, তাঁরা ২৩শে মার্চ, ২০১৩ থেকে ত্রিপুরা হাইকোর্টের বিচারপতি হন। ২০১৩ সালের ২৩শে মার্চ ত্রিপুরার রাজ্যপাল ডঃ ডি. ওয়াই. পাটিল রাজভবনের দরবার হলে উচ্চপদাধিকারীদের উপস্থিতিতে ত্রিপুরা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি এবং অন্যান্য বিচারপতিদের শপথবাক্য পাঠ করান। ত্রিপুরা হাইকোর্টের ন্যায়বিচার প্রদানের নিরলস যাত্রা এইভাবে শুরু হয়েছে, ২৩শে মার্চ, ২০১৩-এর অবিস্মরণীয় দিন থেকে।